বাংলাদেশ থেকে উমরাহ: ১৪ দিনের সফর আসলে কেমন হয়
ঢাকা থেকে ১৪ দিনের উমরাহ সফরের দিনভিত্তিক পূর্ণ চিত্র: ফ্লাইট, ইহরাম, ধারাবাহিকভাবে উমরাহর আমল, মক্কা-মদিনার জিয়ারত, কী কী নেবেন, আর প্রথমবার যাওয়া হাজিদের যেসব কথা কেউ বলে না।
লিখেছেন রায়হান মাহমুদপ্রকাশিতহালনাগাদ ৪ মিনিটে পড়ুন

ঢাকা থেকে ১৪ দিনের উমরাহ সফরে সাধারণত প্রায় এক সপ্তাহ কাটে মক্কায়, বাকি সময় মদিনায়; ফ্লাইট, হোটেল, খাবার, ভিসা ও যাতায়াত সবই থাকে এক প্যাকেজের মধ্যে। এই গাইডে পুরো সফরটি ধাপে ধাপে সাজানো হলো, যাতে যাওয়ার আগেই জানা থাকে কী হতে চলেছে। আমাদের ১৪ দিনের উমরাহ প্যাকেজ ঠিক এই কাঠামোতেই সাজানো: রিয়াদ এয়ারের ফ্লাইট (স্বল্প ট্রানজিট), দুই হারামের হাঁটা দূরত্বে হোটেল, প্রতিদিন তিন বেলা খাবার এবং গ্রুপের সঙ্গে অভিজ্ঞ আলেম।
🕋 সবার আগে যা জরুরি: উমরাহ ভিসা আসে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধিত হজ ও ওমরাহ এজেন্সির মাধ্যমে, যারা সৌদি উমরাহ কোম্পানির সঙ্গে কাজ করে। কাউকে টাকা দেওয়ার আগে লাইসেন্স নম্বরটি যাচাই করুন।
যাত্রা: ঢাকা থেকে মক্কা
গ্রুপ যাত্রা শুরু করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উপসাগরীয় কোনো শহরে এক স্টপ দিয়ে। ২০২৬ সালের আগস্ট থেকে রিয়াদ এয়ার প্রতিদিন বোয়িং ৭৮৭-৯ উড়োজাহাজে ঢাকা–রিয়াদ ফ্লাইট চালাচ্ছে, সেখান থেকে জেদ্দার সংযোগে ট্রানজিট সময় কম থাকে। জেদ্দায় ইমিগ্রেশন ও লাগেজ শেষে এসি বাসে মক্কা পৌঁছাতে সময় লাগে দেড় ঘণ্টার মতো।
ইহরাম ঢাকা থেকেই পরে নিন বা সঙ্গে রাখুন। মিকাত অতিক্রমের আগে ঠিক কখন ইহরাম বাঁধতে হবে, তা গ্রুপের আলেম জানিয়ে দেবেন এবং সবাইকে নিয়ে তালবিয়া পড়বেন। ইহরাম, স্যান্ডেল, ওষুধ ও কাগজপত্র একটি ছোট ব্যাগে হাতব্যাগে রাখুন, যাতে চেক-ইন লাগেজ দেরিতে এলেও সমস্যা না হয়।
ধাপে ধাপে উমরাহ
- মিকাতের আগে ইহরাম বাঁধুন: পুরুষদের জন্য সেলাইবিহীন দুই টুকরো সাদা কাপড়, নারীদের জন্য স্বাভাবিক শালীন পোশাক; এরপর নিয়ত ও তালবিয়া।
- মসজিদুল হারামে তাওয়াফ করুন: হাজরে আসওয়াদের কোণ থেকে শুরু করে কাবার চারপাশে সাত চক্কর।
- সুযোগ থাকলে মাকামে ইবরাহিমের পেছনে দুই রাকাত নামাজ পড়ুন এবং জমজম পান করুন।
- সাঈ করুন: সাফা থেকে শুরু করে মারওয়ায় শেষ—মোট সাতবার।
- শেষে হলক (মাথা মুণ্ডানো) বা কসর (চুল ছোট করা)। এতে উমরাহ পূর্ণ হয় এবং ইহরামের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়।
গ্রুপে থাকলে এই পুরো আমল আলেমের নেতৃত্বে একসঙ্গে করা হয় এবং প্রতিটি ধাপ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এ কারণেই প্রথমবার যাওয়া হাজি ও বয়স্ক বাবা-মায়ের জন্য একা যাওয়ার চেয়ে গাইডসহ প্যাকেজ অনেক সহজ হয়।
মক্কার দিনগুলো
দিন কাটে হারামে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঘিরে। হোটেল চত্বর থেকে ৬০০–৭০০ মিটার দূরে হলে হাঁটতে লাগে প্রায় ১০ মিনিট, ফলে দুই ওয়াক্তের মাঝে হোটেলে ফিরে বিশ্রাম নেওয়া যায়। এর ফাঁকে নফল তাওয়াফ, কোরআন তিলাওয়াত আর হারামে বসে সময় কাটানো। প্রয়োজনে মসজিদের ভেতরেই হুইলচেয়ার ভাড়া পাওয়া যায়, আর তাওয়াফের জন্য ওপরের তলাগুলোতে ভিড় কম থাকে।
মক্কার জিয়ারত
- জাবালে নূর: যে পাহাড়ে হেরা গুহা, সেখানেই প্রথম ওহি নাজিল হয়। গ্রুপ সাধারণত নিচ থেকে দেখায়; ওপরে ওঠার পথ দীর্ঘ ও খাড়া।
- জাবালে ছওর: হিজরতের সময় নবীজি ﷺ ও আবু বকর (রা.) যে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।
- মিনা, মুজদালিফা ও আরাফাত: হজের স্থানগুলো, মৌসুমের বাইরে শান্ত; আরাফাতে আছে জাবালে রহমত।
- জান্নাতুল মুয়াল্লা: মক্কার ঐতিহাসিক কবরস্থান।
মদিনা: অন্যরকম প্রশান্তি
এসি বাসে মক্কা থেকে মদিনার পথে সময় লাগে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা, মাঝে বিশ্রাম ও নামাজের বিরতি থাকে। মক্কার তুলনায় মদিনা শান্ত, আর বেশিরভাগ হাজি একে সফরের প্রশান্তির অংশ বলেন। মসজিদে নববী থেকে ৭০০–৮০০ মিটার দূরত্বের হোটেল হলে প্রতি ওয়াক্তেই হেঁটে যাওয়া যায়।
রিয়াজুল জান্নাহ (রওজা শরিফ) জিয়ারতের জন্য নুসুক অ্যাপে বিনা খরচের পারমিট বুক করতে হয়, আর সময় আগেভাগে ছাড়া হয়। গ্রুপ লিডার বুকিংয়ে সহায়তা করেন; যত আগে সম্ভব বুক করুন, কারণ বিশেষ করে নারীদের সময়ের স্লট দ্রুত শেষ হয়ে যায়।
মদিনার জিয়ারত
- মসজিদে কুবা: ইসলামের প্রথম মসজিদ; সেখানে দুই রাকাত নামাজে বিপুল সওয়াবের কথা হাদিসে এসেছে।
- মসজিদে কিবলাতাইন: যেখানে কিবলা পরিবর্তিত হয়ে কাবার দিকে হয়।
- ওহুদ পাহাড়: ওহুদ যুদ্ধের প্রান্তর ও হজরত হামজা (রা.)-সহ শহীদদের কবরস্থান।
- সাত মসজিদ: খন্দকের যুদ্ধের এলাকা।
সঙ্গে কী নেবেন
ধরন | যা নেবেন |
ইহরাম | পুরুষদের দুই সেট, সুগন্ধিবিহীন সাবান, মানি বেল্ট, আরামদায়ক স্যান্ডেল |
পোশাক | হালকা শালীন পোশাক; শীতে মদিনার রাতের জন্য একটি গরম কাপড় |
স্বাস্থ্য | নিয়মিত ওষুধ ও প্রেসক্রিপশন, ব্যথার ওষুধ, ফোসকার ব্যান্ডেজ, খাবার স্যালাইন |
কাগজপত্র | পাসপোর্ট, ভিসার প্রিন্ট, টিকার সনদ, হোটেল ও গ্রুপের যোগাযোগ তালিকা |
দরকারি | ভাঁজ করা জায়নামাজ, জুতা রাখার ছোট ব্যাগ, পানির বোতল, পাওয়ার ব্যাংক, সৌদি সিম বা ই-সিম |
প্রথমবার যাঁরা যান, তাঁদের সাধারণ প্রশ্ন
- টাকা-পয়সা: ছোটখাটো কেনাকাটার জন্য সৌদি রিয়াল সঙ্গে রাখুন; দোকান ও মলে কার্ড চলে। যাত্রার আগে ব্যাংক থেকে বৈদেশিক মুদ্রা এনডোর্স করিয়ে নিন।
- খাবার: ফুল বোর্ড প্যাকেজে দিনে তিন বেলা খাবার থাকে, যা নামাজ শেষে ক্লান্ত অবস্থায় সবচেয়ে কাজে দেয়। দুই শহরেই বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় খাবারের রেস্তোরাঁ প্রচুর।
- পানি: দুই হারামের ভেতরেই জমজম বিনা খরচে পাওয়া যায়। প্যাকেজে রুমের পানি না থাকলে মসজিদ থেকে বোতলে করে আনুন বা স্থানীয়ভাবে কিনে নিন।
- জমজম দেশে আনা: প্রত্যেক হাজি একটি সিলযুক্ত ৫ লিটারের জমজম বোতল বিমানের কার্গোতে দিতে পারেন; কেবিনে নেওয়া যায় না।
- ফোন: স্থানীয় সিম বা ই-সিম থাকলে নুসুক পারমিট, ম্যাপ ও দেশে কথা বলা সহজ হয়, আর গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে।
- হাঁটা: প্রতিদিন ৮,০০০–১৫,০০০ কদম হাঁটার প্রস্তুতি রাখুন। যাত্রার আগেই স্যান্ডেল পায়ে মানিয়ে নিন, আর কারও হুইলচেয়ার লাগলে আগেভাগে এজেন্সিকে জানান।
বয়স্ক হাজিদের জন্য পরামর্শ
খরচ কিছুটা বেশি হলেও হারামের কাছের হোটেল বেছে নিন; বয়স্কদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় হাঁটার দূরত্বই। গাইডসহ গ্রুপের সঙ্গে যান, প্রেসক্রিপশনের ইংরেজি কপি সঙ্গে রাখুন, হোটেলের নাম ও গ্রুপের নম্বর লেখা একটি কার্ড পকেটে রাখুন, আর জিয়ারতের দিনটিকে বিশ্রামের দিন ধরে পরিকল্পনা করুন। দুই মসজিদেই হুইলচেয়ার ও সহায়তাকারী পাওয়া যায়।
যাত্রার প্রস্তুতি নেবেন?
জনপ্রতি ১,৪০,০০০ টাকায় আমাদের ১৪ দিনের উমরাহ প্যাকেজে কী কী আছে দেখে নিন, আবেদনের আগে উমরাহ ভিসার নিয়ম পড়ুন, অথবা আপনার পরিকল্পনা জানান; আমাদের টিম পরবর্তী গ্রুপ যাত্রার বিস্তারিত জানিয়ে দেবে।
সৌদি আরব (ওমরাহ) ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন?
কী কী লাগবে তা আমাদের সৌদি আরব (ওমরাহ) ভিসা গাইডে দেখে নিন, অথবা হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিন — আবেদনে আমরা সাহায্য করব।



